ঢাকা : নামটা বেশ বড়। টিপ্পি বেঞ্জামিন ওকান্টি ডেগ্রি। ছোট্ট এ মেয়েটি
জন্মের পর প্রথম দশ বছর বাবা-মার সঙ্গে আফ্রিকাতেই কাটায়। বাবা সৌখিন
ফটোগ্রাফার। বনে জঙ্গলে ঘুরতে পছন্দ করেন। নিজ দেশ ফ্রান্স থেকে যখন
আফ্রিকার জঙ্গলে স্ত্রীকে নিযে ঘুরছিলেন ঠিক সে সময়ে আফ্রিকার নামিবিয়াতেই
জন্ম হয় টিপ্পির। তারপর যেন পুরোটাই একটা রোমাঞ্চকর গল্প। ডেইলি মেইল
অবলম্বনে জানাচ্ছেন মো.
টিপ্পির
এ রোমাঞ্চকর গল্প যেন হার মানায় বিখ্যাত ছবি ‘মোগলি’কে। রুডইয়ার্ড
কিপলিংয়ের ‘দ্য জাঙ্গল বুক’ অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে এর প্রধান চরিত্র
মোগলিকে সবসময় বনে জঙ্গলে পশুপাখির সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। বনের
পশুপাখিই যেন তার সহচর। সে যেমন ভালবাসত পশু-পাখি আর প্রকৃতিকে। ঠিক তেমনি
প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা এ অবোধ প্রাণীগুলোও মোগলিকে ভালবেসে ফেলে। এটাতো আমরা
দেখেছি টিভির পর্দায়। কিন্তু টিপ্পি হচ্ছে বাস্তবের এক মোগলি।
আফ্রিকার
জঙ্গলে একদিকে শৌখিন ফটোগ্রাফার বাবা বনে-জঙ্গলে ছবি তোলার নেশায় ছুটে
বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে জঙ্গলের পশু-প্রাণীর সঙ্গে বেড়ে উঠছে টিপ্পি। বাঘ,
সিংহ, হাতি, উঠপাখি, সাপ এমন কোনো ভয়ঙ্কর প্রাণী নেই যার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব
গড়ে উঠেনি। এসব ভয়ঙ্কর প্রাণীর সঙ্গে ওর বেশিরভাগ সময় কাটে। জংলি মানুষের
সঙ্গেও সখ্য কম নয়। জংলি মানুষগুলোও টিপ্পিকে তাদের পরিবারেরই সদস্য মনে
করে। তারা টিপ্পিকে মাঝে মাঝে জংলি পোশাক পরিয়ে দিত। ওদের সঙ্গে শিকারে
নিয়ে যেত। তবে শিকার ওর পছন্দ ছিল না। যে সময়টায় ওর কাটানোর কথা ফ্রান্সের
মত উন্নত একটি দেশে। তার যেখানে সভ্য মানুষ আর তথ্য প্রযুক্তির সব
নিত্যনতুন বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা; সেখানে সে দিন কাটাচ্ছে দক্ষিণ
আফ্রিকা, নামিবিয়া আর বতসোয়ানার ঘোর জঙ্গলে। যে জঙ্গলের মানুষেরা ফলমূল
আহরণ আর পশু শিকার করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। নামিবিয়ার জঙ্গলে এক
চিতার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে টিপ্পির। আর চিতাটাও তাকে ছাড়া কিছু বুঝত
না। সারাদিন এ চিতার সঙ্গে টই টই করে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো ও। চিতাকে গোসল
করিয়ে দিত। খাইয়ে দিত। এমনকি একসঙ্গে ঘুমাতো। টিপ্পির এরকম স্বাধীন
পশুপ্রেমী জীবনটা ওর বাবা-মাও খুব উপভোগ করতো। তাই তারা ওকে কোনো বাঁধা দিত
না। ওকে ওর মতো থাকতে দিত।
বতসোয়ানায়
এসে এক হাতির সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল টিপ্পির। আবু নামের এ হাতিটির পিঠে
চড়ে বতসোয়ানার গভীর জঙ্গলে সারাদিন ঘুরে বেড়াত সে। তেমনি ছিল একটি উঠপাখি।
লিন্ডা নামের এ উটপাখিটির গলা জড়িয়ে ধরে রাখত সবসময়।
টিপ্পির মা
সিলভি বলেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী বন-জঙ্গল, প্রাকৃতিক পরিবেশ এসব খুব পছন্দ
করি। আফ্রিকায় আসার পর টিপ্পির জন্ম হয়। আমরা এখানেই থেকে গেলাম। দেখতে
পেলাম প্রকৃতিপ্রেমে আমাদেরও ছাড়িয়ে গেল টিপ্পি। অবাক হয়ে দেখতে থাকলাম কি
স্বাভাবিকভাবে ও বাঘ, সিংহ, হাতি এমনকি সাপের সঙ্গে মিশছে। আরও অদ্ভুত বিষয়
হচ্ছে, ওই ভয়ঙ্কর প্রাণীগুলোও অবলীলায় ওর বন্ধুত্ব গ্রহণ করছে। এটা আমাদের
যেমন ভালো লাগল তেমনি ওর ভবিষ্যৎ ভেবে শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। তাই ওর সুন্দর
ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা আবার ফ্রান্সে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিই।
এরপর
শুরু হয় টিপ্পির সভ্য জীবনের এক নতুন অধ্যায়। প্যারিসে এসে ভর্তি হয়
স্কুলে। শুরু হয় লেখাপড়া। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন তার মন বসছিল না। সবসময়
মনমরা হয়ে থাকত। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেশ সময় লাগল। এরপর
প্যারিসে কেটে গেল আরও ১৩ বছর। টিপ্পি এখন ২৩ বছরের তরুণী। চলচ্চিত্র বিষয়ে
পড়াশোনা করছেন প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। টিপ্পির মা সিলভি বলেন, এখন
স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও আফ্রিকায় ফেলে আসা ১০টি বছর সে খুব মিস করে।
তিনি বলেন, ওর সে সময়ের ছবিগুলো এতদিন আমাদের পারিবারিক অ্যালবামেই ছিল। আর
কাহিনীও স্বজনরা ছাড়া তেমন কেউ জানত না। তবে ওর সেই সব রোমাঞ্চকর দিনগুলোর
কথা যাতে সবাই জানতে পারে সেজন্য আমরা বেশ কিছু ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের
সুযোগ করে দেই।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন