রাজশাহী: বরেন্দ্র অঞ্চলে কাঁসা-পিতল ছিল ঐতিহ্যমণ্ডিত এক শিল্প। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে এ শিল্পের ঐতিহ্য।
আগে
থেকেই মুসলিম পরিবারগুলোতে কাঁসা-পিতলের ব্যবহার তেমন না হলেও হিন্দু
সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনও বিশেষ কদর আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে
কণ্যা সম্প্রদান, অন্নপ্রাসনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাঁসার তৈরি বিভিন্ন
তৈজসপত্র উপহার হিসেবে দিয়ে থাকেন।
তবে
বর্তমান সময়ে হিন্দুদের ভেতরেও কাঁসা-পিতলের ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে।
মাত্র এক যুগ আগেই রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কাঁসা-পিতল শিল্পের
ব্যাপক প্রসার ছিল। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এ শিল্প এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। এ
শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই এখন অন্য পেশা বেছে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
রাজশাহী
জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার হাটপাড়া, সুলতানগঞ্জ, রেলবাজার, বালিয়া ঘাট্টা,
পিরিজপুর, কাঁকন হাট, মহিশান বাড়ি, বিদিরপুর, প্রেমতলী, রাজাবাড়ীসহ এলাকার
বাজারগুলোতে উৎকৃষ্টমানের নিপুন নকশার তৈরি কাঁসা ও পিতলের জিনিসপত্র পাওয়া
যেতো। এ অঞ্চলে এ শিল্পের ওপর নির্ভর করে ৪ থেকে ৫ হাজার পরিবার তাদের
সংসার চালাতো।
তবে
বর্তমানে মন্দাভাব থাকার কারণে অনেকেই এ শিল্প ছেড়ে অন্য পেশায় নেমেছে। এ
অঞ্চলে শিল্পটি টিকিয়ে রেখেছে হাতেগোনা কয়েকজন পুরানো ব্যবসায়ী।
গোড়াগাড়ী
বাজারের কাঁসা-পিতল ব্যবসায়ী আবদুল আওয়াল জানান, তিনি ১৫ বছর ধরে এ ব্যবসা
করছেন। এখন আর আগের মতো ব্যবসা হয়না। বর্তমান বাজারে কাঁসা-পিতলের তৈরি
জিনিসের কদর কমে এসেছে।
তিনি
আরও জানান, বর্তমানে বাজারে কাঁসা এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ২
হাজার টাকা ও পিতল ৪৫০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাশাপাশি বাজারে মেলামাইন, স্টিল, সিলভার,
প্লাস্টিক এবং সিরামিক্স সামগ্রী বাজার দখল করায় কাঁসা-পিতলের ব্যবহার
দিনে দিনে কমে আসছে।
কাঁসা
ও পিতল বিক্রেতা টুটুল জানান, মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর আগেই প্রতি কেজি
কাঁসা-পিতল বিক্রি হতো ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। বর্তমানে এর দাম প্রায় ১০ গুণ
বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, বর্তমান সময়ে এ ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে ২ থেকে ৩
লাখ টাকার প্রয়োজন। আবার ব্যবসার অবস্থাও আগের মতো জমজমাট নেই। অনেকেই তাই এ
ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় জড়িত হচ্ছেন।
নওগাঁ
জেলার পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর, ধামইর হাট উপজেলার বদলগাছি এলাকার অনেক
মানুষ এ শিল্পকে জীবিকা হিসেবে মনে করতো। তবে এ ধরনের মানুষ এখন খুঁজে
পাওয়া ভার। এখন হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ ছাড়া অন্যরা শিল্পটিকে আগেই ছেড়ে
বিভিন্ন পেশা বেঁচে থাকার জন্য বেছে নিয়েছে।
পত্নীতলা
উপজেলার নজিপুর এলাকার গণেষ বাবু নামে এক কাঁসা-পিতল ব্যবসায়ী জানান,
হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে কাঁসার তৈজসপত্র কেনার প্রয়োজন। এছাড়াও
হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো অনুষ্ঠানে কাঁসা-পিতলের চাহিদা থাকে। তবে বর্তমান
সময়ে দাম বেশি হওয়ার কারণে এখন ধনী শ্রেণির হিন্দুরা ছাড়া তেমন আর কেউ
কাঁসার জিনিস কিনতে চান না।
রাজশাহী
মহানগরীর আলুপট্টি মোড়ে পুরানো একটি দোকানে পুরানো কাঁসা-পিতল গলিয়ে নতুন
করে আসবাবপত্র তৈরি করেন জানু নামের এক কারিগর। এ শিল্পের সঙ্গে তিনি ৪০
বছর থেকে আছেন।
জানু
জানান, মাত্র ১০ বছর আগেই অনেক দূরের এলাকার থেকে তার কাছে কাঁসা-পিতলের
তৈরি জিনিস নেয়ার জন্য অর্ডার আসতো। কাজ করে শেষ করা যেতোনা। ১৫ বছর আগেই
কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে কাঁসা-পিতলের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র অনেকেই উপহার
হিসেবে দিতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে কাঁসার তৈরি জিনিসপত্র কেউ উপহার দিতে
চায়না। বর্তমানে তাকে অনেকটা বেকার সময় কাটাতে হচ্ছে।
অনেকেই
এখন কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন জিনিসপত্র ঘরের শোভা বর্ধনের জন্য সাজিয়ে রাখে।
কাঁসা-পিতলের জিনিসের চাহিদা মানুষের কাছে আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। তাই এ
শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা অনেকেই ধীরে ধীরে বেকার হয়ে পড়ছেন।
এ
ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা জানান, প্রকৃতপক্ষে কাঁসা-পিতলের কাঁচামালের সরবরাহ,
সংকট ও দুষ্প্রাপ্যতা ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে দিনে
দিনে হারিয়ে যাচ্ছে এ শিল্পটি। এর পাশাপাশি এ পণ্যর চাহিদার কমে যাওয়ার
কারণে শিল্পটি পুনরায় উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন