বেডসিন শ্যুট করা সহজ কথা নয়৷ এ ধরনের দৃশ্য শ্যুট করায় সত্যিই খুব
মুন্সিয়ানার প্রয়োজন হয়৷ একটা জড়তা তো থাকেই৷ টেনশনও থাকে
অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং পরিচালকের মধ্যে৷নগ্নদৃশ্য শ্যুটিং-এর
ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয়, সব কিছুর পরেও যেন দৃশ্যটি শৈল্পিক হয়৷ রুচিসম্মত
হয়৷
অথচ যেন অবাস্তব না লাগে৷ শুধু নগ্ন দৃশ্য কেন, ধরা যাক একটা দৃশ্য,
যেখানে নায়িকা পোশাক পাল্টানোর জন্য শাড়ি ছাড়ছে, আর হঠাত্ ঘরে কেউ ঢুকে
এসে অপ্রস্ত্তত হয়ে যাবে৷ এই শাড়ি ছাড়ার মধ্যে থাকে একটা চাপা উত্তেজনা অথচ
মিনিস্কার্ট বা হটপ্যান্ট পরে অবলীলায় নায়িকা যখন নাচের দৃশ্য করেন, তখন
তেমন রাখঢাক ব্যাপারটা থাকে না৷
ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘দহন’ ছবিতে দু’টি
রোমাঞ্চক আর এক অর্থে কিছুটা নিষিদ্ধ এবং শক্ত দৃশ্য ছিল৷ একটা ছিল
ইন্দ্রানী ও সঞ্জীব দাশগুপ্তর চুম্বন দৃশ্য, অন্যটি ঋতুপর্ণা ও অভিষেকের
‘রেপ ইন ম্যারেজ’ দৃশ্য৷ প্রথমটির জন্য সিনেম্যাটোগ্রাফার হরি নায়ার তৈরি
করে ছিলেন আলো আঁধারি পরিবেশ৷ তা-ও অধিকাংশ কলাকুশলীকে ঋতুপর্ণ বাইরে বার
করে দিয়েছিল৷ আমি, হরি আর ওঁর ফোকাস পুলার, রানা ও ঋতুপর্ণ ছিলাম এই দৃশ্য
শ্যুটিং-এর সময়৷ বজবজের একটি বাড়িতে হয়েছিল এটি৷ এই দৃশ্য নিয়ে অনেক
গুঞ্জন, গুজগুজ ফুসফুস হয়েছিল৷ এমনকী তা প্রযোজকের কানেও যায়৷ তিনি
চিত্রনাট্য পড়ার সময় এই দৃশ্যের কথা অতটা বুঝতে পারেননি, কিন্ত্ত
চুম্বনদৃশ্যের কথা পরে শুনে বেশ প্রসন্নই হয়েছিলেন৷ এর পর কলকাতায় মনোহর
পুকুর রোডের এক বাড়িতে ওই ‘রেপ ইন ম্যারেজ’ সিন-এর শ্যুটিং-এর আয়োজন হয়৷ এই
দৃশ্যে ঋতুপর্ণার জন্য আনা হয় নাইট ড্রেস৷ ফুরফুরে হালকা নাইট ড্রেস-এর
তলায় অন্তর্বাস পরলে সেটা বাস্তব সম্মত হবে কি, হবে না, তা নিয়েও চলে
আলোচনা গবেষণা৷ অবশেষে সব ঠিকঠাক৷ ঋতুপর্ণা ও অভিষেক মানসিক ভাবে
প্রস্ত্তত৷ মাত্র ক’জন থাকবে ঘরটিতে৷ হরি, ঋতুপর্ণ, আমি (মেয়ে বলে) আর একজন
সহকারি৷ এমনকী ফোকাস পুলারেরও জায়গা নেই, হরি নিজেই ফোকাস করবে৷ এমন সময়
শ্যুটিং দেখতে চলে এলেন প্রযোজক মহাশয়৷ আমরা সবাই টেনসড৷ এমন একটি
স্পর্শকাতর দৃশ্যর শ্যুটিং হবে, যেখানে কলাকুশলীরাই ঢুকতে পারছে না, সেখানে
প্রযোজক ঢুকবেন কী করে! কী হবে… উনি তো তেমন আসেনও না শ্যুটিং-এ৷ আজ এলেন…
অথচ ওঁকে অশ্রদ্ধা করাও যায় না৷ ঋতুপর্ণ কিন্ত্ত এ ব্যাপারে একেবারে খুব
দৃঢ় মনস্ক ছিল৷ ওর কাছে ওর ছবির চেয়ে বড় কিছু ছিল না৷ আর ছবি ঠিক করে
শ্যুট করতে হলে অভিনেতা-অভিনেত্রীর কমফর্ট লেভেল বা সোয়াস্তি দেখাটা
পরিচালকের কাজ৷ তাই খুব সহজেই ঋতুপর্ণ নিজে গিয়ে প্রযোজককে বলল, ‘আজ তো আমি
আর আমার গুটি কয়েক ক্রু সদস্য ছাড়া আর কেউ শ্যুটিং-এ থাকতে পারবে না, তাই
আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি অন্য কোনও দিন আসুন৷ কিংবা যদি খুব দেখতে ইচ্ছে
করে দৃশ্যটি, তা হলে এডিটিং-এর সময় চলে আসুন৷’ ঋতুপর্ণর কাছে সিনেমা
তৈরিটাই ছিল মূল, তার জন্য কাউকে স্পষ্ট কথা বলতে ছাড়ত না৷ এমনকী
প্রযোজককেও না৷
পরবর্তী সময়ে আমি ও অভিজিত্ যখন ‘তিন ইয়ারি কথা’
ছবিটা তৈরি করি, তখন ঋতুপর্ণর ওই অ্যাটিটিউড-এর স্মৃতিটা খুব কাজে লেগেছিল৷
বিশেষত জুন ও শাশ্বতর সজ্জা দৃশ্যের ক্ষেত্রে৷ যখন রুদ্র ও নীল (সুজন)
ফুটো দিয়ে দেখার চেষ্টা করে৷ এই দৃশ্যটার শ্যুটিং করার সময় আমি ও আমাদের
চিত্রগ্রাহক দেবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলাম ফ্লোরে, অন্যরা পিছনে৷ রানা মানে
অভিজিত্ মনিটর-এ৷ সাধারণত আমাদের কাজের ক্ষেত্রে রানাই অগ্রণী ভূমিকা নেয়
ফ্লোরে৷ কিন্ত্ত এক্ষেত্রে ও ছিল মনিটার-এ৷ অভিনেতাদ্বয়ের সুবিধার্থে৷
যেহেতু দৃশ্যটায় ওরা ফুটো দিয়ে দেখছিল, তাই ক্যামেরার সামনে একটা মাস্কিং
অর্থাত্ কার্ডবোর্ড ফুটো করে লাগানো হয়৷ ফলে স্ক্রিনে দৃশ্য দেখার
এফেক্টটা ফুটোর ভিতর দিয়ে মনে হতে থাকে৷ এরই মধ্যে আমরা বলতে থাকি, ‘হ্যাঁ
পিঠের দিকে মুখটা দে’, ইয়েস, এবার আঁচলটা…’৷ বাকিটা না হয় উহ্যই থাক৷
অভিনেতাদের কতটা দর হওয়া প্রয়োজন ভাবুন তো! পুরো সিকোয়েন্সটা করতে হবে
ক্যামেরার সামনে, শুনতে হবে পরিচালকের ইনস্ট্রাকশন, পুরো ব্যাপারটা হতে হবে
পরিশীলিত, অথচ বাস্তবসম্মত… নাহ্, সহজ নয়, মোটেই সহজ নয়৷
এই সূত্রে
মনে পড়ে যাচ্ছে, আমাদের একটি টেলিফিল্ম-এর কথা৷ তাতে অভিনয় করেছিল পল্লবী৷
খুবই বোল্ড একটি চরিত্র৷ একটি মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে ভাগ্যের ফেরে এক বস্তিতে
এসে পড়ে৷ সেখানে এক গুন্ডার বিষনজরে পড়ে যায় সে৷ এক দুপুরে এই গুন্ডা তাকে
ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়৷ এই ধর্ষণের দৃশ্য শ্যুটিং-এ বেশ বেগ পাচ্ছিলাম আমি,
অভিজিত্ আর শান্তিলাল৷ শান্তি হয়েছিল সেই গুন্ডা৷ চলছে জল্পনাকল্পনা, কী
ভাবে দৃশ্যটি ঠিক করে শ্যুট করা যায়৷ কোথায় হাত দেবে, কী ভাবে মাটিতে
শোয়াবে ইত্যাদি ইত্যাদি… হঠাত্ পল্লবী বলল, ‘ছাড়ো তো তোমাদের এত আলোচনা৷
এই শান্তি, আয় কোমরে হাত দে, অন্য হাতটা দিয়ে জড়িয়ে ধর, মুখটা আমার মুখের
কাছে আন, একটু প্রেসার দে, আমি নীচে নেমে যাব তুইও নামার…’ পুরো ঘটনাটা কী
সরল, সাবলীল ভাবে করে ফেলল, পল্লবী ও শান্তি৷ পল্লবীর ইনস্ট্রাকশন শুনে সব
জড়তা গেলে কেটে৷
তবে আজও এ ধরনের দৃশ্য শ্যুট করতে একটা উত্তেজনা, একটা চাপ, একটা অন্য অনুভূতি কাজ করে৷ টাইমস ইন্ডিয়া।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন