কালাম আজাদ, ২৪ অক্টোবর. কক্সবাজার: কক্সবাজার জেলার ব্যবসা বাণিজ্য এখন জামাতÑশিবির ও এর সমর্থকদের দখলে। জেলাব্যাপী সংগঠনটির নেতাকর্মীরা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি মুদ্রামানের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এ সব ব্যবসায় বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় সংগঠনটির
৫ হাজারের অধিক নেতা-কর্মীর কর্মরত রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে ঠিকাদারি, রিয়েল এস্টেট, ব্যাংক, হাসপাতাল, বীমা, কিন্ডার গার্টেন স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে এমন কোন স্থান নেই যেখানে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের বিস্তৃতি ঘটেনি। সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জামায়াতের অর্থায়নে পরিচালিত ২২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়। এ সময় জেলা আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তায় জেলাব্যাপী জামাতÑশিবির বিস্তার লাভ করে জঙ্গী তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। এই ২২ টি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ইসলামি ব্যাংক, ইবনে সিনা, কোরাল রিফ, মিশন গ্রুপ, রাবেতা হাসপাতাল, কেয়ারি সিন্দবাদ, সি-লাইন পরিবহন, গ্রিন লাইন পরিবহন, আল-বয়ান ইনস্টিটিউট, আল-ফুয়াদ হাসপাতাল, হার্ভার্ড কলেজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইসলামি ব্যাংক, ইবনে সিনা, মিশন গ্রুপ, গ্রিন লাইন, কোরাল রিফ দেশব্যাপী ব্যবসা পরিচালনা করে চলেছে। এ ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো কক্সবাজার কেন্দ্রিক তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। ইতিপূর্বে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেগুলোতে কর্মরতদের জামাতÑশিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি জেলার প্রায় সকলেই জানতেন। কিন্তু এবারই প্রথম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জঙ্গী তৎপরতায় সহযোগিতা করার অভিযোগ ওঠেছে। ফলে জেলার গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে জামাত নিয়ন্ত্রিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা গেছে, কক্সবাজারের জামাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা জড়িত। আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসব নেতা-কর্মী জামাতÑশিবির নেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। শুধু বর্তমান শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামীলীগ নয়, বিএনপিও একইভাবে জামাতÑশিবির নেতাদের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেছিল। কিন্তু ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিএনপি’র নাম বাতিল হয়ে ওই জায়গায় যুক্ত হয়েছে আওয়ামীলীগ। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি নিজেদের কাছে থাকা নগদ টাকাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে জামাতÑশিবির নেতারা। আর এই কৌশল দিয়েই বিগত ৪ বছর ধরে এলজিইডি, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ, শিক্ষা অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং কক্সবাজার পৌরসভায় একচ্ছত্র ঠিকাদারি বাণিজ্য চালিয়েছে জামাতÑশিবির নেতারা।
শুধু ঠিকাদারি সংস্থা নয়। স্থানীয় সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরাও রয়েছেন এই তালিকার। সরকারের পক্ষ তাঁদের (এমপি) নামে চাল ও গমের যে বরাদ্দ থেকে দেয়া হয় এর বেশিরভাগের ক্রেতা জামাতÑশিবিরের নেতা। জামাতÑশিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত জেনেও বেশি টাকা পাওয়ার লোভে সংসদ সদস্যরা ডিও লেটারগুলো জামাতÑশিবির নেতাদের কাছে বিক্রি করে দেন।
যে হার্ভার্ড কলেজের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জঙ্গী তৎপরতার অভিযোগ এনেছে সেটি প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছে কক্সবাজার আওয়ামীলীগের কতিপয় নেতা। রীতিমতো পুলিশ নিয়ে গিয়ে হার্ভার্ড কলেজের বর্তমান জায়গাটি জামাতকে দখল করে দিয়েছেন তাঁরা। বিনিময়ে জামাতÑশিবিরের কাছ থেকে নিয়েছেন মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা। অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকের বিরুদ্ধে জঙ্গী তৎপরতার অভিযোগ উঠানোর আগে পর্যন্ত বেশ কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতা ওই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্যানেলে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়া সেলিম নেওয়াজ তাঁদেরই একজন। এ ছাড়া জেলা আওয়ামীলীগের আরো বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা রয়েছেন যাঁরা ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক সুবিধা ভোগী। এ কারণে জেলাব্যাপী জামাতÑশিবিরের পক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে কোন সমস্যা হয়নি।
জানা যায়, জামাতÑশিবির মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের একটি অংশ সংগঠনের তহবিলে জমা দিতে হয়। এরপর ওই অর্থ থেকে জামাতের নেতাদের দেয়া হয় মাসিক বেতনসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা । এমন কি সংগঠনের নেতাদের যাতায়াতের যে যানবাহন রয়েছে সেটির জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে ড্রাইভারের বেতন পর্যন্ত ওই টাকা থেকে দেয়া হয়। বিনিময়ে আর্থিক সুবিধাভোগী এসব নেতা সাংগঠনিক কার্যক্রম ছাড়া অন্য কিছু করতে পারেন না।
এদিকে, জামাতÑশিবিরের বিরুদ্ধে জঙ্গী তৎপরতার অভিযোগ ওঠার পর থেকে আর্থিক সুবিধাভোগী এসব নেতারা গা ঢাকা দিয়েছেন। মাঝে মাঝে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় সংবাদপত্রগুলোতে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর মধ্যেই তাঁদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, সংবাদ সম্মেলন করার পর আওয়ামীলীগ নেতারাও এখন আর বিষয়টি নিয়ে জোর গলায় কিছু বলছেন না। ফলে, জঙ্গী সহায়তার মতো স্পর্শকাতর ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন