দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ের মাধ্যমে
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ছোট করা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব
রক্ষা হোক ভারত তা চায় না। এই রায়ের মাধ্যমে মনে হয়েছে বাংলাদেশ যেন ভারতের
কাছে একটি বন্ধকী রাজ্য (মর্টগেজ)।
ভারতের জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ‘টাইমস অব
আসামে’ এর অনলাইন সংস্করণে বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রতিবেদনে এসব কথা বলা
হয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্র
মামলার রায়ের ওপর প্রতিবেদনটি লিখেছেন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাংবাদিক ও গবেষক জয়নাল আবেদিন।
টাইমস অব আসামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায়
১০টি ট্রাক ভর্তি বিপুল অস্ত্রের চালান আটক করা হয়। দীর্ঘ ১০ বছর পর ২০১৪
সালের ৩১ জানুয়ারি এ মামলার রায় হয়। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার এ রায় নিয়ে
স্বাধীন বিশ্লেষকদের পাশাপাশি রাজনীতি, আইন-বিচার, সামরিক ও গোয়েন্দা
বিশ্লেষকরাও শঙ্কিত।
রায়ে সাবেক দুইজন মন্ত্রী, ডিজিএফআই ও এনএসআই’র মহাপরিচালক (ডিজি) এবং
উলফার সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ুয়াসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
এর রায়ের মধ্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মনে
হয়েছে তিন দিক থেকে ভারত কর্তৃক বেষ্টিত এই দেশটি যেন ভারতের কাছে বন্ধক
(মর্টগেজ ) রয়েছে। কারণ, এই মামলা ও রায়ে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। যা করা
হয়েছে কেবলই ভারতের স্বার্থে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্র চোরাচালানি সারাবিশ্বেই একটি সাধারণ ব্যাপার।
আর ভারত এই কাজটি (অস্ত্র চারাচালানি) আনুষ্ঠানিকভাবে করে থাকে। কারণ,
তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাংলাদেশসহ সকল প্রতিবেশি দেশগুলোর মধ্যে ভাঙন
সৃষ্টি করা ও অস্থিতিশীল করে তোলা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানির পুরো ঘটনাটি
বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করা হয়েছে। কিন্তু এই মামলার অনুসন্ধান প্রক্রিয়া ও
রায়ের ক্ষেত্রে কিছুটা ত্রুটি রয়েছে।
এই মামলায় অভিযুক্ত যাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তাদের অধিকাংশই এই
ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাছাড়া কোনো অস্ত্র চোরাচালানির ঘটনায় কারো ফাঁসি
হয়েছে এ কথা আগে কখনো শোনা যায়নি। এমনকি চট্টগ্রামেও যদি কেউ হাতেনাতে ধরা
পড়তো তার হওয়ার কথা ছিল না।
অভিযোগ রয়েছে, চার্জশিট গঠন, দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া, চার্জশিটে বারবার
নতুন অভিযুক্তদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা, তদন্ত কর্মকর্তা বদলি, তদন্ত
প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে বারবার সময় বাড়ানো এবং বিচার প্রক্রিয়া সব
কিছুতেই ভারতের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। নানা কৌশল করে ভারত তাদের মিত্র শেখ
হাসিনা সরকারকে দিয়ে এই রায় দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। এর মাধ্যমে নিজেদের নীতি
(পলিসি) বাস্তবায়ন এবং স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে। ভারত তাদের এই
কৌশলের মাধ্যমে শুধু ১৪ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ই দেয়নি, তারা
প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ হচ্ছে ভারত বিরোধী সন্ত্রাস বা চরমপন্থীদের জন্য
নিরাপদ আবাস, যা সত্যিই লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে।
‘অপ্রত্যাশিত এই রায়ের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বলেছেন, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর (বাংলাদেশ) এক চিমটি মাটিও
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সন্ত্রাসীদেরকে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। যখন তিনি
(হাসিনা) এই ধরনের বক্তব্য দেন তখন তিনি হয়তো ভুলে যান যে, ভারত নিজের
মাটিতেই সন্ত্রাসী লালন-পালন করে আর নির্মূল করতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের
সহায়তা চায়।
সামরিক বিশেজ্ঞদের মতে, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ে উলফা নেতা পরেশ
বড়ুয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, এই মামলায় ব্যাপক
প্রভাব খাটানো হয়েছে এবং আমাদের সার্বভৌমত্বকে ছোট করা হয়েছে। আর এই
মুহূর্তে এই ধরনের একটি রায় ভারতের জন্য খুবই দরকার ছিল।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
রায়ের পক্ষে যে যুক্তি দেখিয়েছেন (বাংলাদেশ সার্বভৌম এবং এর মাটি
প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করতে দেয়া হবে না)। ভারতেরও
এক্ষেত্রে একই নীতি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শেখ হাসিনা যা বলেন ভারত তার
উল্টোটা করে। ভারত শুধু বাংলাদেশের মাটিই ব্যবহার করে না। তারা তাদের সব
বাহিনীকে বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যবহার করে।
স্মরণাতীতকাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) বাংলাদেশের একটি
অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ এই অঞ্চলকে ভোগদখল করে রাখেনি। এটি বাংলাদেশের
নিজস্ব অংশ। কিন্তু ভারত বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে ১৯৭৩ সাল থেকেই পাবর্ত্য
অঞ্চলকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষ্যেই
ভারত মানবেন্দ নারায়ণ লারমাকে প্ররোচিত করে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি
সমিতি (পিসিজেএসএস) নামে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ এবং এর সামরিক শাখা
‘শান্তি বাহিনীর’ জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে ভারত শান্তি বাহিনীকে অর্থ
সহায়তা দিয়েছে। তাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এর কর্মীদের প্রশিক্ষণ
দিয়েছে। তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। ভারতের সাংবাদিক অশোকা রায়না তার
‘ইনসাইড ‘র’ ডুটে: দ্য স্টরি অব ইন্ডিয়াস সেক্রেট সার্ভিস‘ নামের বইটির
৮৬-৮৭ পৃষ্ঠায় এ সংক্রান্ত বেশ কিছু দলিলপত্র (ডকুমেন্টস) তুলে ধরেছেন।
১৯৮১ সালে বিকাশ পাবলিশার্স নামে নয়া দিল্লির একটি প্রকাশনা সংস্থা বইটি
প্রকাশ করে।
বইতে অশোকা রায়না বলেন, ‘র’ চাকমা গেরিলাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসলে চাকমারা ‘র’ এর সঙ্গে
যোগাযোগ করে। তখন তারা মিজো বিদ্রোহীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে ভারতের কাছে
তথ্য পাচারের প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে তারা রাজনৈতিক আশ্রয় চায়। ভারত সরকার
তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়।
অশোক বিশ্বাস নিউ ন্যাশনে প্রকাশিত একটি লেখায় বলেন, ‘‘বাংলাদেশে
বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালানোর উদ্দেশ্যে ‘র’ চাকমা উপজাতি এবং শান্তি বাহিনীর
সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে (নিউ ন্যাশন: ৩১ আগস্ট, ১৯৯৪)।’’
এখানে ভারতীয় সাংবাদিক বিবিসির করেসপন্ডেন্ট সুবির ভৌমিকের একটি উদ্ধৃতি
তুলে দেয়া জরুরি। সুবির ভৌমিক ঢাকাভিত্তিক পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘প্রোব’ কে
দেয়া এক সাক্ষাৎকারে (বর্ষ ১, সংখ্যা ৪, সেপ্টেম্বর ১-১৫, ২০০১) বলেন,
‘‘আপনি আমার বই ‘আরম’ (১৯৭৫-১৯৯০) দেখুন। সেখানে ‘র’ সমর্থিত শান্তি বাহিনী
নিয়ে একটি লেখা আছে। তাতে বলা হয়েছে, ১৯৭৬ সালের পর শান্তি বাহিনী যখন
আন্ডারগাউন্ডে চলে গেল, তখন শান্তি বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে
গিয়েছিল। মনে রাখবেন, ভারতে সাধারণ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য নেয়া
হয়নি। সেখানে নেয়া হয়েছিল নেতৃত্বস্থানীয়দের। আর মাধ্যমে মাধ্যমে ভার
মানবেন্দ নারায়ণ লারমাকে ৫০ হাজার গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্র অস্ত্র
সজ্জিত করার প্রস্তুতির কথা জানিয়ে দিয়েছিল।
আর এ লক্ষ্যেই ভারত তখন ত্রিপুরা ও মিজোরাম ও দেহরাদুনের নিকটবর্তী
চক্রাতা এলাকায় ক্যাম্প খুলে দেয়। ১৯৯৪ সালে শান্তি বাহিনীর ক্যাডার
ত্রিবিদ চাকমা ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, শান্তি
বাহিনীর সন্ত্রাসীরা ভারতীয় অংশে ২৫টি ক্যাম্প খুলেছে। এর মধ্যে তিনি ৯টি
ক্যাম্পের নাম উল্লেখ করেন। সেগুলো হচ্ছে, সাবরাম, শিলচর, বয়ালপাড়া,
কদমতলী, দায়েক, বড়চারী, রালমা, ত্রিমাঘা এবং রতননগর। তিনি আরো জানান,
দেহরাদুনে বিশ্বস্ত কিছু লোককে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে।
১৯৯৮ সালের ৩ জুলাই ঢাকার ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘ফ্রাইডে’ জানায়, জিয়াউর
রহমান সরকারের সঙ্গে মানবেন্দ নারায়ণ লারমা সমঝোতা বিষয়টি ব্যর্থ হয়েছিল।
কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সামরিক শাখা শান্তি
বাহিনীকে ভারত তখন চাপের মুখে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে কাজ করতে বাধ্য
করেছিল।
পরবর্তীতে এটাও প্রকাশ হয় যে, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ঐক্যে
ফাঁটল ধরে। এক পর্যায়ে ১৯৮৩ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রিতিকুমার গ্রুপের সদস্যরা
মানবেন্দ নারায়ণ লারমাকে তার ৮ জন সহযোদ্ধাসহ গুলি করে হত্যা করে। তখন
ভারত সরকার পিত্রিকুমার চাকমার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি তথাকথিত
শান্তি চুক্তি হওয়ার পরও তাকে ভারতে আশ্রয় দিয়েছে ভারত সরকার।
খাগড়াছড়ি পাবর্ত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান সামিরান
দেওয়ান ‘শান্তি বাহিনীকে প্রশ্রয়, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রদানে ভারত
দায়ী’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেন, ‘ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক
ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে শান্তি বাহিনী কাজ করে না। বরং তারা ভারতের
ভূ-রাজনৈতিক নীল-নকশা বাস্তবায়নে কাজ করছে
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন